ধানমন্ডি ৩২ ভাঙচুর: ইতিহাসের বাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপ, তীব্র বিতর্ক দেশে-বিদেশে
দোয়েল নিউজ ডেস্ক | ঢাকা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবন ও বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর–খ্যাত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙচুর ও ধ্বংসকে ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়া। রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পাশাপাশি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তুমুল তর্ক-বিতর্ক চলছে।
কী ঘটেছে ধানমন্ডি ৩২ এ?
রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে অবস্থিত এই বাড়িটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারের বহু সদস্যের সঙ্গে এখানেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পরবর্তীতে এই বাড়িটি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত হয়।
তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এ বাড়িটিকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরা বুলডোজার ও ভারী যন্ত্র নিয়ে হামলা চালায়।
চোখের সামনে ভাঙা হয় বাড়ির দেয়াল, ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলা হয় বিভিন্ন কক্ষের অংশ, ভেতরের বহু স্মারক ও সামগ্রী তছনছ হয়ে যায়। কোথাও কোথাও আগুনও দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়েছে নানা গণমাধ্যম।
‘জনরোষ’ নাকি পরিকল্পিত ধ্বংস?
এ ঘটনার পর থেকেই মূল বিতর্ক ঘুরছে এক প্রশ্নকে ঘিরে—
এটি কি স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষের বহিঃপ্রকাশ, নাকি পরিকল্পিত ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংসের চেষ্টা?
বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ দাবি করছে,
-
দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসন, দমন-পীড়ন, গুম–খুন ও দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে তারা ধানমন্ডি ৩২–কে টার্গেট করেছে।
-
তাদের ভাষায়, “ইতিহাসের নামে একদলীয় প্রচারণার স্মারক ভেঙে ফেলা হয়েছে।”
অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণকারী নাগরিক সমাজের অনেকেই বলছেন,
-
যে বাড়িতে ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে,
-
যে বাড়ি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্নের নানা সিদ্ধান্তের সাক্ষী,
তাকে ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধের নামে’ ভেঙে ফেলা ইতিহাস, স্মৃতি ও রাষ্ট্রের স্বীকৃত ঐতিহ্যের ওপর নগ্ন আঘাত।
রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এ হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ও ভূমিকা নিয়েও তোলপাড় চলছে।
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—
-
এতো বড় একটা ঐতিহাসিক স্থাপনায়
-
দিনের বেলায়
-
বুলডোজার ও ভারী যন্ত্র নিয়ে লোকজন প্রবেশ করে ভাঙচুর চালালো,
তবু কেন দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা গেল না?
একে অনেকেই “নীরব সম্মতি” বা “চোখ বন্ধ করে থাকা” বলে সমালোচনা করছেন।
সরকারি মহল অবশ্য বলছে, পরিস্থিতি আকস্মিকভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল, এবং পরবর্তীতে তারা এলাকা ঘিরে ফেলে নতুন করে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঠেকিয়েছে।
রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
এ ঘটনার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন।
-
এক পক্ষ বলছে, এটি “স্বৈরাচারবিরোধী জনবিক্ষোভের অংশ”, যেখানে প্রতীকী লক্ষ্য হিসেবে ধানমন্ডি ৩২ নির্বাচন করা হয়েছে।
-
অন্য পক্ষের দাবি, এই হামলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ফলে ধানমন্ডি ৩২ এখন কেবল একটি ভাঙা বাড়ি নয়—
এটি হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতি, ইতিহাস ও পরিচিতি নিয়ে নতুন করে বিভক্তির প্রতীক।
নতুন প্রজন্ম কী ভাবছে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, নতুন প্রজন্মও এ ঘটনাকে ঘিরে দুই মেরুতে বিভক্ত—
-
কেউ লিখছে, “ইতিহাস মানে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো জাতি। সেই ইতিহাসের বাড়ি ভাঙা মানে নিজেদের অতীতকে ভাঙা।”
-
অন্য কেউ বলছে, “যারা বছরের পর বছর জনগণের কণ্ঠরোধ করেছে, তাদের প্রতীকী পতন হয়েছে মাত্র।”
এদিকে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের একটি অংশ সতর্ক করে বলেছেন,
রাজনৈতিক রাগ বা প্রতিশোধের নামে ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করলে পরবর্তী প্রজন্মের শেখার জায়গা কমে যাবে, আর ভবিষ্যতে সত্য–মিথ্যা আলাদা করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
সামনে কী হতে পারে?
ধ্বংস হওয়া ধানমন্ডি ৩২–কে ঘিরে এখন দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি বড় প্রশ্ন—
-
রাষ্ট্র কি এই জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থাপনাটি পুনর্গঠন করবে?
-
এ ঘটনায় সরাসরি জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি?
-
ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করে ইতিহাস–সম্পৃক্ত স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি?
বিশ্লেষকদের মতে, যেভাবেই হোক, ধানমন্ডি ৩২–এর ভবিষ্যৎ ঠিক করা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও ইতিহাস–বোধের বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন