‘৩৬ জুলাই’-পরবর্তী বাস্তবতা; পীরগঞ্জে সাংবাদিকতার আড়ালে প্রভাব ও প্রটেকশন মানির অদৃশ্য জাল!!
‘৩৬ জুলাই’-পরবর্তী বাস্তবতা; পীরগঞ্জে সাংবাদিকতার আড়ালে প্রভাব ও প্রটেকশন মানির অদৃশ্য জাল!!
সাকিব আহসান
প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে একটি নীরব কিন্তু উদ্বেগজনক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘৩৬ জুলাই’-এর পর রাতারাতি কিছু সাংবাদিকের জীবনযাত্রায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে যা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও সংশয়ের জন্ম দিচ্ছে। এই পরিবর্তনকে অনেকে আখ্যা দিচ্ছেন “আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া” হিসেবে। বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে একটি জটিল ও সংবেদনশীল বাস্তবতা, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উঠে আসছে তথাকথিত ‘প্রটেকশন মানি’।
সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা যার মূল ভিত্তি সত্য অনুসন্ধান, জনস্বার্থ রক্ষা এবং ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন এই পেশার কিছু ব্যক্তি নিজেদের প্রভাবকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করতে শুরু করেন, তখন পুরো পেশাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। পীরগঞ্জে এমন অভিযোগ উঠছে যে, কিছু ব্যক্তি সংবাদ সংগ্রহের আড়ালে ব্যবসায়ী, ঠিকাদার কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ‘সুরক্ষা’ দেওয়ার নামে অর্থ আদায় করছেন। এই অর্থের বিনিময়ে তারা হয়তো কোনো অনিয়ম প্রকাশ না করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, অথবা বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করছেন।
এই প্রবণতা কেন তৈরি হচ্ছে—তা বিশ্লেষণ করা জরুরি। প্রথমত, স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতার পেশাগত কাঠামো দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রেই কোনো প্রশিক্ষণ, নীতিমালা বা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই ব্যক্তি নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। ফলে জবাবদিহিতা কমে যাচ্ছে এবং অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা একটি বড় কারণ। অনেকেই নিয়মিত বেতন বা স্থায়ী আয় না পাওয়ায় বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন, যা কখনো কখনো অনৈতিক চর্চার দিকে ঠেলে দেয়।
তৃতীয়ত, প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি। যদি স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো কার্যকরভাবে তদারকি করত, তাহলে এই ধরনের অভিযোগ এতটা বিস্তৃত আকার ধারণ করত না। বরং একটি সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হতো, যেখানে প্রকৃত সাংবাদিকরা সম্মান ও নিরাপত্তা পেতেন।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। কারণ, তারা নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যখন সংবাদ বিকৃত হয় বা ইচ্ছাকৃতভাবে চেপে রাখা হয়, তখন সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় এবং দুর্নীতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। একই সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, যারা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন।
তবে পুরো চিত্রটিকে একপাক্ষিকভাবে দেখা উচিত নয়। পীরগঞ্জে এখনো অনেক সৎ ও পেশাদার সাংবাদিক রয়েছেন, যারা প্রতিকূলতার মধ্যেও নীতির প্রশ্নে আপস করেন না। তাদের কাজই প্রমাণ করে—সাংবাদিকতা এখনো সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।
সমাধানের পথ কী? প্রথমত, সাংবাদিকদের জন্য বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের প্রতিনিধিদের ওপর কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। তৃতীয়ত, প্রশাসনকে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজকেও সোচ্চার হতে হবে যাতে অনিয়মের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
পীরগঞ্জের এই পরিবর্তন কেবল একটি উপজেলার সমস্যা নয়; এটি বৃহত্তর গণমাধ্যম ব্যবস্থার একটি প্রতিফলন। তাই এখনই সময় আত্মসমালোচনার—কারণ সাংবাদিকতা যদি আস্থার সংকটে পড়ে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো সমাজই।

আপনার মতামত লিখুন