গোধূলির ধানক্ষেতে লক্ষ্মী-ববিতার আলাপন ; সংগ্রাম, স্বপ্ন ও টিকে থাকার লড়াই
গোধূলির ধানক্ষেতে লক্ষ্মী-ববিতার আলাপন ; সংগ্রাম, স্বপ্ন ও টিকে থাকার লড়াই
সাকিব আহসান,
প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার বাঁশগাড়া। গোধূলির আলো ধীরে ধীরে নেমে এসেছে ধানক্ষেতের ওপর। পশ্চিম আকাশে লালচে সূর্য ডুবে যাচ্ছে, জমির পানিতে তার প্রতিফলন ঝিকমিক করছে। সারাদিনের পরিশ্রমের শেষে হাঁটুসমান পানিতে দাঁড়িয়ে এখনো রোপা লাগাচ্ছেন লক্ষ্মী রাণী আর ববিতা রাণী। হাতের গতি কিছুটা ধীর, কিন্তু কথার ভাঁজে জমে আছে দিনের সারাংশ।
লক্ষ্মী রাণী আকাশের রঙ বদলাতে বদলাতে বললেন,
“দিন ফুরায়, কাজ ফুরায় না। চালের দাম যেভাবে বাড়ছে, এ ধান যদি ঠিকমতো না হয়, সংসার টিকবে কীভাবে?”
ববিতা কাদামাটি থেকে চারা তুলে সারিতে বসাতে বসাতে জবাব দিলেন,
“ধান ফলালেও কি আর নিশ্চিন্তি আছে? সার, বীজ, কীটনাশক সবকিছুর দাম বাড়ছে। হিসাব কষতে গেলে লাভের চেয়ে দুশ্চিন্তাই বেশি।”
গোধূলির শান্ত দৃশ্যের ভেতর তাদের কথায় ধরা পড়ে গ্রামীণ অর্থনীতির অস্থিরতা। উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত নয়। কৃষক যেমন চাপের মুখে, তেমনি ভোক্তাও মূল্যবৃদ্ধিতে ক্লান্ত। এই দ্বৈত সংকট যেন সন্ধ্যার আলো অন্ধকারের মতোই অনিশ্চিত।
লক্ষ্মী রাণী একটু থেমে বললেন,
“আগে পরিবারের সবাই মিলে কাজ করতাম। এখন ছেলেরা শহরে যেতে চায়। মাঠে দাঁড়াতে চায় না। মজুরি দিতে গেলে অর্ধেক লাভ চলে যায়।”
ববিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তবু তো থামা যায় না। বাজারে গেলে দেখি তেল, ডাল, লবণ সবকিছুর দাম বেড়েছে। সংসার চালানোই যেন বড় যুদ্ধ।”
গোধূলির হালকা বাতাসে তাদের শাড়ির আঁচল দুলে ওঠে। দূরে গরু, ছাগল ঘরে ফিরছে, গ্রামের মসজিদে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। এই সময়টাতে কাজ গুটিয়ে নেওয়ার কথা, কিন্তু তারা শেষ সারির চারা বসাতে ব্যস্ত।
কথা ঘুরে যায় সন্তানের ভবিষ্যতের দিকে।
লক্ষ্মী রাণী বললেন,
“মেয়েটাকে কলেজে পড়াতে চাই। যেন আমাদের মতো শুধু জমির ওপর ভরসা করে না থাকতে হয়।”
ববিতা সায় দিলেন।
“আমরাও চাই ওরা ভালো থাকুক। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করে চাকরি কোথায়? গ্রামে কাজ নেই, শহরে গেলে খরচ বেশি।”
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ পরিবারগুলোর বাস্তবতা এমনই কৃষি টিকে আছে, কিন্তু নিরাপত্তা নেই। জলবায়ুর অনিশ্চয়তা নতুন করে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।
লক্ষ্মী রাণী পশ্চিম আকাশের মেঘের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আবহাওয়ার ঠিক নেই। কখন বৃষ্টি, কখন খরা, বোঝা যায় না। গত বছর বন্যায় অনেক ক্ষতি হলো।”
ববিতা মাথা নাড়লেন।
“আমাদের সব ভরসা এই জমি। কিন্তু জমিও আগের মতো স্থির নেই।”
গোধূলির আলো আরও ম্লান হয়। পানির ভেতর রোপা চারা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন নতুন দিনের প্রতিশ্রুতি। সারাদিনের ক্লান্তি সত্ত্বেও তাদের চোখে নিভে যায়নি আশার দীপ।
এই দুই নারী শুধু নিজেদের সংসার নয়, দেশের কৃষিরও নীরব চালিকাশক্তি। অনেক পুরুষ বাইরে কাজের খোঁজে চলে যাওয়ায় মাঠে নারীর উপস্থিতি বেড়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ঋণপ্রাপ্তি বা বাজার ব্যবস্থায় তাদের ভূমিকা এখনো সীমিত। তবু তারা থেমে নেই।
লক্ষ্মী রাণী শেষ চারা বসিয়ে বললেন,
“কষ্ট করতে ভয় নেই। শুধু চাই, পরিশ্রমের দামটা যেন পাই।”
ববিতা দৃঢ় কণ্ঠে যোগ করলেন,
“ধান ভালো হলে, দাম ঠিক থাকলে আমাদেরও মুখে হাসি থাকবে।”
সূর্য পুরোপুরি ডুবে যায়। আকাশে গাঢ় নীল অন্ধকার নেমে আসে। তারা ধীরে ধীরে জমি থেকে উঠে বাঁধের দিকে হাঁটেন। পেছনে রয়ে যায় সারি সারি রোপা যেন গোধূলির বুক চিরে বোনা ভবিষ্যতের স্বপ্ন। বাঁশগাড়ার সেই সন্ধ্যা শুধু দিনের সমাপ্তি নয়; এটি সংগ্রাম আর আশার সহাবস্থানের এক জীবন্ত
নিদর্শন।

আপনার মতামত লিখুন