ঈদকে তুরুপের তাস, তেলের সংকটকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, প্যানিক বাইং ও বাজার সিন্ডিকেটের চাপে সাধারণ মানুষ!!!
ঈদকে তুরুপের তাস, তেলের সংকটকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, প্যানিক বাইং ও বাজার সিন্ডিকেটের চাপে সাধারণ মানুষ!!!
সাকিব আহসান
প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
ঈদ ঘনিয়ে এলে দেশের বাজারে সাধারণত উৎসবের আমেজ দেখা যায়। কিন্তু সেই আনন্দ অনেক সময় চাপা পড়ে যায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে। বিশেষ করে ভোজ্যতেলকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে এক ধরনের প্যানিক বাইং অর্থাৎ আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটার প্রবণতা। এই পরিস্থিতিকে অনেক ব্যবসায়ী ও মুনাফাখোর গোষ্ঠী যেন তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলাফল ড়ড়সীমিত আয়ের মানুষদের নিত্যদিনের সংসার ব্যয় হয়ে উঠছে অসহনীয়।
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঈদের আগমুহূর্তে ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বাড়ে। কিন্তু সেই চাহিদাকে কেন্দ্র করে যখন বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, তখন পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। খুচরা বাজারে তেলের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া কিংবা দোকানে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লেই ক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকে তখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুত করতে শুরু করেন। এই মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়াকেই বলা হয় প্যানিক বাইং।
সমস্যা হলো, এই আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে একটি অসাধু ব্যবসায়ীচক্র বাজারে প্রভাব বিস্তার করে। তারা কখনো গুদামে পণ্য আটকে রাখে, কখনো সরবরাহ কমিয়ে দেয়, আবার কখনো পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে খুচরা বাজারে এসে তেলের দাম হয়ে যায় গগণছোঁয়া। অথচ উৎপাদন বা আমদানি পর্যায়ে এমন বড় ধরনের সংকট থাকে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্যানিক বাইং মূলত একটি চেইন রিঅ্যাকশন। বাজারে গুজব বা সীমিত সরবরাহের খবর ছড়ালেই ক্রেতারা আতঙ্কে বেশি করে কিনতে শুরু করেন। সেই অতিরিক্ত চাহিদা আবার বাজারে বাস্তব সংকট তৈরি করে। এই সুযোগেই মুনাফাখোররা দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ।
একজন দিনমজুর বা স্বল্প আয়ের চাকরিজীবীর জন্য রান্নার তেল একটি মৌলিক প্রয়োজনীয় পণ্য। যখন এই পণ্যের দাম হঠাৎ করে কয়েক দফা বেড়ে যায়, তখন তাদের সংসারের হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। একজন রিকশাচালক বা শ্রমিকের দৈনিক আয়ে পরিবার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে অতিরিক্ত দামে তেল কিনতে বাধ্য হওয়া যেন এক ধরনের নীরব শাস্তি।
ঈদকে ঘিরে এই পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। উৎসবের সময় মানুষ একটু ভালো খাওয়ার প্রত্যাশা করে। কিন্তু বাজারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সেই আনন্দকে বিষাদে পরিণত করে। অনেক পরিবার তখন বাধ্য হয়ে খাদ্যতালিকা সংকুচিত করে ফেলে। উৎসবের খাবারের পরিবর্তে চলে আসে কঠোর মিতব্যয়িতা।
পীরগঞ্জ সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিষয়ক অধ্যাপকের মতে, বাজারে স্বচ্ছতা ও কার্যকর তদারকির অভাব থাকলে এমন পরিস্থিতি বারবার তৈরি হবে। পণ্যের সরবরাহ, মজুত ও মূল্য নির্ধারণের প্রতিটি স্তরে যদি কঠোর নজরদারি না থাকে, তাহলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেবে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের মধ্যেও সচেতনতা প্রয়োজন, যাতে গুজব বা আতঙ্কে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা না বাড়ে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজার তদারকি, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি ন্যায্যমূল্যের দোকান ও সরকারি সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা গেলে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।
ঈদ মানুষের আনন্দ ও ভাগাভাগির উৎসব। কিন্তু যখন বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সেই আনন্দের জায়গা দখল করে নেয় হতাশা। ভোজ্যতেলকে ঘিরে প্যানিক বাইং এবং মুনাফাখোরদের কারসাজি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও।
কারণ একটি সমাজ তখনই সুস্থ থাকে, যখন উৎসবের আনন্দ ধনী-গরিব সবার ঘরেই সমানভাবে পৌঁছাতে পারে। আর সেই লক্ষ্য পূরণে বাজারের ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

আপনার মতামত লিখুন