রূপগঞ্জে প্রচারণার গর্জন শেষ: ব্যালট যুদ্ধে ত্রিমুখী লড়াই ও গণভোটের অপেক্ষা
মোঃ রাশেদুল ইসলাম (রাশেদ), রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
ঘড়ির কাঁটা ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল (৭ঃ৩০মিনিট) সাড়ে সাতটা পার হওয়ার সাথে সাথেই থেমে গেছে রূপগঞ্জের নির্বাচনী প্রচারণার দীর্ঘ কলরব। রাজপথের মাইকিং, মিছিল আর স্লোগানে যে জনপদ গত কয়েকদিন প্রকম্পিত ছিল, সেখানে এখন নেমে এসেছে এক রহস্যময় নীরবতা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সারাদেশে ঐতিহাসিক গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। তারাবো ও কাঞ্চন পৌরসভা এবং রূপগঞ্জের সাতটি ইউনিয়ন—মুড়াপাড়া, গোলাকান্দাইল, ভুলতা, দাউদপুর, ভোলাবো, কায়েতপাড়া ও রূপগঞ্জ সদর—এখন যেন এক বিশাল রণক্ষেত্র, যেখানে প্রচারণার গর্জন শেষ হয়ে শুরু হয়েছে ব্যালট বাক্সের রায়ের অপেক্ষা।
এই নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে রূপগঞ্জের রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় লক্ষ্য করা গেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী দুলাল হোসেন এবং গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী ওয়াসিম উদ্দিন আকস্মিকভাবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে ধানের শীষের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। এই একক মেরুকরণের ফলে দিপুর পালে এখন নতুন হাওয়া বইছে। ভুলতা ও গোলাকান্দাইলের জনবহুল মোড় থেকে শুরু করে দাউদপুর ও ভোলাবোর মেঠোপথ পর্যন্ত দিপু ভূঁইয়ার শো-ডাউনগুলো শেষ সময়ে জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। বিএনপির এই হেভিওয়েট প্রার্থী তারুণ্যের উদ্দীপনা আর রাজপথের শক্তিকে পুঁজি করে রূপগঞ্জকে নিজের দুর্গে পরিণত করতে মরিয়া হয়ে মাঠে ছিলেন।
তবে রাজপথের এই উচ্চকণ্ঠ প্রচারণাকে খুব একটা গায়ে মাখছেন না দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আনোয়ার হোসেন মোল্লা। তিনি খেলছেন এক সুক্ষ্ম ও হিসেবি খেলা। কায়েতপাড়া ও মুড়াপাড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে আনোয়ার মোল্লার কর্মীরা বড় মিছিলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ‘ডোর-টু-ডোর’ বা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারণায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই ‘নীরব বিপ্লব’ নির্বাচনের দিন বড় ধরনের ওলটপালট ঘটিয়ে দিতে পারে। পাড়া-মহল্লায় আনোয়ার মোল্লার যে নিজস্ব ও সুশৃঙ্খল ভোটব্যাংক রয়েছে, তারা যদি সুপরিকল্পিতভাবে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে, তবে বাজিমাত করা দাঁড়িপাল্লার জন্য অসম্ভব কিছু নয়।
এই দুই মেরুর লড়াইয়ের মাঝে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত রেখেছেন মুফতি ইমদাদুল্লাহ হাসেমী। রূপগঞ্জের সাতটি ইউনিয়নে তার একনিষ্ঠ অনুসারীরা প্রচারণার শেষ সময় পর্যন্ত সরব উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। বিশেষ করে ধর্মপ্রাণ ভোটারদের একটি বড় অংশ যদি হাতপাখার বাক্সে ভোট দেয়, তবে তা ধানের শীষ এবং দাঁড়িপাল্লা—উভয় পক্ষের জন্যই বড় বিপত্তির কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে আপেল প্রতীক নিয়ে নতুন ধারার রাজনীতির বার্তা দিচ্ছেন ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. রেহান আফজাল।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এই আসনের ১২৯টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রূপগঞ্জের ৪ লাখ ৮ হাজার ৮২৯ জন ভোটার এবার দুটি ব্যালটে ভোট দেবেন। পছন্দের সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য ব্যবহার করবেন সাদা ব্যালট এবং জুলাই জাতীয় সনদ (প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ সীমাবদ্ধতা ও দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদসহ বিভিন্ন সংস্কার) অনুমোদনের জন্য গণভোটে ব্যবহার করবেন গোলাপি ব্যালট। প্রচারণার কোলাহল শেষে রূপগঞ্জ এখন এক থমথমে নীরবতায় ডুবে আছে। শেষ পর্যন্ত কি দিপুর রাজপথের উন্মাদনা জিতবে, নাকি আনোয়ার মোল্লার নীরব কৌশল সফল হবে—তা দেখতে এখন মুখিয়ে আছে পুরো জনপদ।

মোঃ রাশেদুল ইসলাম (রাশেদ), রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ