নির্বাচন শেষ, ব্যানার রয়ে গেল! আইন কোথায় দাঁড়িয়ে?

সাকিব আহসান নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১:৪৪ অপরাহ্ণ

নির্বাচন শেষ, ব্যানার রয়ে গেল! আইন কোথায় দাঁড়িয়ে?

সাকিব আহসান
নিজস্ব প্রতিবেদক

নির্বাচন শেষ হয়েছে, ফল প্রকাশিত, জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণার ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার এখনও ঝুলছে সড়কের মোড়, বিদ্যুতের খুঁটি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়াল এবং বাজারের প্রবেশপথে। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল নান্দনিকতার সমস্যা, নাকি সরাসরি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন?
বাংলাদেশে নির্বাচন পরিচালিত হয় বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন’র তত্ত্বাবধানে। আচরণবিধি সংক্রান্ত প্রধান আইন হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন আচরণবিধি, ২০০৮ (পরিমার্জিত)। এই আচরণবিধির ধারা ৭ ও ধারা ১২-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন স্থাপন নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং ভোটগ্রহণ শেষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা অপসারণ করতে হবে। সাধারণত ফলাফল ঘোষণার পর ৩ দিনের মধ্যে সব প্রচারসামগ্রী সরিয়ে ফেলার বাধ্যবাধকতা থাকে।
এছাড়া নির্বাচন কমিশন আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৯১(খ) অনুযায়ী, আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে যার মধ্যে জরিমানা, প্রার্থীর বিরুদ্ধে শোকজ কিংবা আইনানুগ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ১৮৮ প্রযোজ্য হতে পারে, যেখানে সরকারি আদেশ অমান্য করলে শাস্তির বিধান রয়েছে।
শুধু নির্বাচনী আইন নয়, জনসাধারণের পথঘাট, সরকারি স্থাপনা বা বৈদ্যুতিক খুঁটিতে অবৈধভাবে ব্যানার টানানো স্থানীয় সরকার আইনেরও লঙ্ঘন। সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা অধ্যাদেশ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া এমন স্থাপনা অপসারণযোগ্য এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যে ক্ষোভ স্পষ্ট। বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল করিম বলেন, “ভোটের আগে প্রতিদিন নতুন ব্যানার লাগানো হয়েছে। এখন ফল হয়ে গেছে, কিন্তু এগুলো আর নামানো হচ্ছে না। ঝড়ে পড়ে গেলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।” কলেজপড়ুয়া এক শিক্ষার্থী জানান, “রাস্তার মোড়ে এত ব্যানার ঝুলছে যে সাইনবোর্ড দেখা যায় না। এটা নিরাপত্তার ঝুঁকি।”
তবে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একটি অংশ দাবি করেন, অনেক সময় কর্মীরা দায়িত্ব নিলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব ব্যানার নামানো সম্ভব হয় না। কিন্তু আইন এখানে ‘সদিচ্ছা’ নয়, ‘ফলাফল’ দেখে। অর্থাৎ অপসারণ না হলে দায় এড়ানোর সুযোগ সীমিত।
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, “আচরণবিধি অনুযায়ী ফল ঘোষণার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব প্রচারসামগ্রী সরিয়ে ফেলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের লিখিত ও মৌখিকভাবে অবহিত করেছি। নির্ধারিত সময়ের পরও ব্যানার না সরালে কমিশনের নির্দেশনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা প্রার্থীদের নৈতিক দায়িত্বও বটে।
এখানে একটি নীতিগত প্রশ্নও উঠে আসে আইন প্রয়োগ কি কেবল নির্বাচনের আগে কঠোর, পরে শিথিল? যদি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক জরিমানা বা দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত না হয়, তবে ভবিষ্যতে একই প্রবণতা পুনরাবৃত্তি হবে। আইন তখন কাগজে থাকবে, বাস্তবে নয়।
প্রথমত, ফল ঘোষণার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে প্রশাসনের মাধ্যমে অপসারণ এবং ব্যয়ের হিসাব সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নির্বাচনী খরচে যুক্ত করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, পুনরাবৃত্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে মনোনয়ন বাতিলের মতো কঠোর শর্ত বিবেচনা করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে যুক্ত করে তদারকি জোরদার করা জরুরি।
নির্বাচন কেবল ভোটের দিনেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া। ব্যানার অপসারণের মতো “ছোট” বিষয়েই আইনের প্রতি সম্মান বা অবহেলা প্রকাশ পায়। প্রশ্ন এখন,আইন কি কার্যকর হবে, নাকি ব্যানারই হবে নির্বাচনের স্থায়ী স্মারক?

প্রিন্ট করুন